আওরঙ্গজেব কামাল : ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর—ভোরের বাতাসে তখন ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা। শহর থেকে গ্রাম, নগর থেকে জনপদ—সবখানেই মানুষ নেমেছিল পথে। রেডিওতে ভেসে এলো এক কণ্ঠস্বর—‘আমি জিয়া বলছি’। মুহূর্তেই যেন মুক্তিযুদ্ধের ২৬ মার্চের দিনটির স্মৃতি ফিরে এলো জনমানসে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মানুষ, বুকের ওপর থেকে সরে গেল ভার। পথে পথে উল্লাস‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। জনতার সঙ্গে সেনাদের মিলনে যেন গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।এই দিনটিকে অনেক বিশ্লেষক বলেন বাংলাদেশের রাজনীতির “টার্নিং পয়েন্ট”একটি দিন, যখন বিশৃঙ্খলা থেকে দেশ ধীরে ধীরে খুঁজে পায় স্থিতি ও দিকনির্দেশনা। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেনা ও জনগণের এক অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বীর বিক্রম মনে করেন—এই দিনটি ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক বিপ্লবী অধ্যায়। তাঁর ভাষায়, “১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে জিয়াউর রহমানই প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেন। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে।তিনি আরও বলেন, “স্বাধীনতার পর যখন দেশ একদলীয় শাসনে পর্যবসিত হলো, তখন সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল ওই অসন্তোষেরই পরিণতি, কিন্তু সেই অভ্যুত্থান সেনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব মূলত সেই পরিস্থিতিরই প্রতিক্রিয়া, যা দেশের সার্বভৌম স্বার্থে এক নতুন পথ খুলে দেয়।অলি আহমেদের মতে, “জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন, কৃষি, শিল্প ও প্রশাসনে সংস্কার আনেন এবং জাতিকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন। তিনি রাজনীতিতে আসতে চাননি, কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে রাষ্ট্রনেতার আসনে বসতে বাধ্য করে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, “১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল সেনাবাহিনীর সবচেয়ে অস্থির সময়। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হয়—এটা সেনাদের কাছে অপমানজনক ছিল।তাঁর মতে, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গঠিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনারা নিজেরাই জিয়াকে মুক্ত করে সেনাপ্রধান হিসেবে পুনঃস্থাপন করেন। “জিয়া তখন চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ফিরিয়ে আনেন,” বলেন তিনি।বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “৭ নভেম্বর ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট। এই দিনেই দেশে বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলে যায়, সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই শুরু হয় নতুন যাত্রা।তাঁর মতে, “জিয়াউর রহমানের মুক্তি কেবল একজন সৈনিকের মুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক।রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “৭ নভেম্বরের মাধ্যমে রাষ্ট্রে যে শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরে আসে, তা ছিল জাতির জন্য নতুন আশার সূচনা। বন্দি জিয়াউর রহমানের মুক্তি জনগণের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরও বলেন, “এ দিনটিকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ভুল হবে। ৭ নভেম্বর জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ঐক্যের প্রতীক। সৈনিক ও জনতার সংহতির যে চিত্র সেইদিন দেখা গিয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।৭ নভেম্বরের সকালটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ছিল ইতিহাসের এমন এক মুহূর্ত, যখন একটি জাতি আবার নতুন করে আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছিল। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের উত্থান, তাঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণ—সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর চিরকাল স্মরণীয় থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে।

