আওরঙ্গজেব কামাল : দেশবাসীর প্রতি সংযম, ধৈর্য ও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। যেকোনো ধরনের উসকানি বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, বরং প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’ সংলগ্ন ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এটিই ছিল দেশবাসীর উদ্দেশে তার প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ।তারেক রহমান বলেন, “এই মঞ্চে যারা উপস্থিত আছেন, যারা মঞ্চের বাইরে আছেন—আমরা সবাই মিলেই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে চাই। জনগণের প্রত্যাশিত একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। এজন্য যেকোনো মূল্যে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। যেকোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর ও শান্ত থাকতে হবে।তিনি তিনবার উচ্চারণ করে বলেন, “আমরা দেশে শান্তি চাই, আমরা দেশে শান্তি চাই, আমরা দেশে শান্তি চাই।তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাঁর একটি সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় শক্তি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ, আপনাদের সহযোগিতায় আমরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।দীর্ঘ নির্বাসন শেষে মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন মুহূর্ত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, প্রায় দেড় যুগের সংগ্রাম ও অপেক্ষার পর আজ তিনি নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়াতে পেরেছেন। এই ফিরে আসা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; বরং এটি জনগণের প্রত্যাশা, ভালোবাসা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ
এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। সেখানে নেতাদের সঙ্গে তিনি কুশল বিনিময় ও আলিঙ্গনে আবেগঘন সময় কাটান।এ সময় তার শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুও ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেন।ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে তিনি খালি পায়ে মাটিতে নেমে দেশের মাটি স্পর্শ করেন এবং একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেন—যা উপস্থিতদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করে। এরপর বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহার না করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা লাল-সবুজ রঙের একটি বাসে উঠে তিনি পূর্বাচলের গণসংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে যাত্রা করেন।বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট এলাকায় পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। পুরো পথজুড়ে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। রাস্তার দুই পাশে এবং আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ স্লোগান, করতালি ও উচ্ছ্বাসে তাকে অভ্যর্থনা জানান। পুরো এলাকা যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছে প্রায় ১৬ মিনিট বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তার সঙ্গে একই বাসে ছিলেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।এর আগে বুধবার দিবাগত রাত ১২টায় তিনি স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের নিয়মিত ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে ফ্লাইটটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টার গ্রাউন্ড টার্নঅ্যারাউন্ড শেষে সকাল ১১টা ১৩ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে এবং ১১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীতে পৌঁছায়।বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারেক রহমানের সর্বপ্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হলো গুরুতর অসুস্থ মাতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখা, যিনি বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি এবং তাদের আবেগ-ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানিয়ে পথে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গণসংবর্ধনা মঞ্চে উপস্থিত হয়ে তিনি বক্তব্য দেন ও দোয়া কামনা করেন। এরপর তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন।দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা ঘিরে সারাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে প্রবল আবেগ, কৌতূহল ও প্রত্যাশা। অনেকের মতে, এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়—এটি দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

