বিশেষ প্রতিনিধি :বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনকে (বিএসসি) একটি সুদৃঢ় ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে সেই অবস্থান ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের বাস্তবায়িত ছয়টি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ঘোষিত লভ্যাংশ বাবদ সরকারের প্রাপ্য অর্থ হিসেবে মোট ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার চেক আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয় এ অনুষ্ঠানে।অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক প্রধান উপদেষ্টার হাতে চেক তুলে দেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসসি যেভাবে ধারাবাহিকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, সেই সাফল্যের ধারা ভবিষ্যতেও বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় দিয়েই বহর সম্প্রসারণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, বিএসসির বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত হলে নাবিকদের পেশাগত উৎসাহ বাড়বে এবং একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি, যাতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নাবিক তৈরি করা যায়। অনুষ্ঠানে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, জি-টু-জি ভিত্তিতে ছয়টি জাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীন সরকারের মধ্যে একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ প্রকল্পে চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে মোট ১,১৯৯,৯৯৯,০৭০ ইউয়ান ঋণ গ্রহণ করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।এই ঋণ পরিশোধের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অর্থ বিভাগ ও বিএসসির মধ্যে একটি সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৩ বছরের মধ্যে বিএসসিকে মোট ২ হাজার ৪২৫ কোটি ২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।তিনি জানান, গ্রেস পিরিয়ডকালীন সুদ বাবদ ৪৭৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি চেক ইতোমধ্যে গত ২৬ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।এই প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিএসসির বহরে ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ যুক্ত হয়। এর মধ্যে পাঁচটি—এমভি বাংলার জয়যাত্রা, বাংলার অর্জন, বাংলার অগ্রযাত্রা, বাংলার অগ্রদূত ও বাংলার অগ্রগতি—বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করছে।বিএসসির ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বশেষ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করে ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছে, যা তাদের সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড। এই সাফল্যের পেছনে বহরে যুক্ত নতুন জাহাজগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য।প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার আলোকে বিএসসি নতুন জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের আওতায় প্রথম জাহাজ ‘বাংলার প্রগতি’ ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ডেলিভারি নিয়ে বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ডেলিভারির জন্য নির্ধারিত রয়েছে।এ ছাড়া সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার, নিজস্ব অর্থায়নে একটি আল্ট্রাম্যাক্স বাল্ক ক্যারিয়ার এবং চীন থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে আরও চারটি বড় জাহাজ সংগ্রহের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা চলমান রয়েছে।

